এই সময়ে এক গেরিলা কবি/তমাল সাহা

কবিবর মাইকেল মধুসূদন দত্তের দ্বিশতবর্ষে নতজানু

এই সময়ে এক গেরিলা কবি
তমাল সাহা

সকলেই বলেছেন মহাকবি তিনি।বয়সের এই প্রান্তিক বেলায় তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখি, কপোতাক্ষ তীরে এমন তীব্র বোধের কবি জন্মেছিল কিভাবে ! রাজনৈতিক বুদ্ধি তার এতো প্রখর ছিল! সে তো কবি, সে কি করে হয়ে গিয়েছিল ভবিষ্যৎদ্রষ্টা যাকে তোমরা বলো জ্যোতিষী!
সে কি আগেই শুনতে পেয়েছিল গেরুয়া পতাকার পদধ্বনি এবং ধর্মের বেসাতি কিভাবে নিয়ে আসবে সাম্প্রদায়িকতা ও সংখ্যালঘুর ব্যাপার-স্যাপার ?
মা নিষাদের আদি কবি বাল্মীকিকে প্রণিপাত করে তার বিপরীতে পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতা! এতো বীররসের প্রাখর্য কেন সে নিয়ে এসেছিল কাব্যধারায়? তোলপাড় ভাঙচুর করে দিয়ে সমস্ত কাব্যরীতি বীরত্বের মহিমা নিয়ে রণভূমে উঠে দাঁড়িয়েছিল এক শব্দ সৈনিক।

কী আশ্চর্য! তখনই সে বুঝেছিল।
গেরিলা পদ্ধতি ধরেছিল কবিতায়।
প্রকৃত দেশপ্রেমের যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকেরা কৌশলী পদ্ধতিতে কাজ করে যাবে সে দেখিয়েছিল, আত্মার আত্মীয়ও যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করবে, সে তো বিভীষণ!
ইন্দ্রজিতের মৃত্যুর আগে ধর্মের প্রসঙ্গে উঠে আসে– কোন ধর্ম মতে, কহ দাসে, শুনি,/ জ্ঞাতিত্ব, ভ্রাতৃত্ব, জাতি– সকলি দিলা/জলাঞ্জলি?

মুখোমুখি লড়াইয়ের আগে গেরিলা পদ্ধতিতে যুদ্ধের কারিগরিতে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। মেঘের আড়ালে কিভাবে যুদ্ধ করতে হয় সে শিখিয়ে গিয়েছিল আমাদের মেঘনাদবধ কাব্যে। এ তো ধর্মবিরুদ্ধতা! দেবতার বিরুদ্ধে মানুষের বিদ্রোহী প্রতাপ। মেঘের আড়ালে মেঘনাদ, দেবরাজ ইন্দ্র পরাহত। মানব বনাম দেবতা সংঘাত, দেবতাকে অস্বীকার করার দুঃসাহস সে-ই তো তুলে এনেছিল কাব্যে। রাম বাতাস প্রবাহিত এই মহাভারতীয় দেশে সে তো সেই কবেই প্রবাদ প্রতিম উচ্চারণ করেছিল, আমি কি ডরাই কভু ভিখারী রাঘবে?

বীর্যবত্তা ছাড়া দেশ শাসন করা যায় না। ‌ভিখারি রাঘব কি কখনো দেশ শাসন করতে পারে? প্রকৃত কোনো রাজা দলিত হত্যা করতে পারে ?
পুরু রাজকে কিভাবে সে উল্লেখ করেছিল ইংরেজি কবিতায়— হোয়ার দা নোবল হার্টস দ্যাট ব্রিডস ফর ফ্রিডম?

সে কি জানতো রামরাজ্যের নামে এরা পর্যায়ক্রমে দেশপ্রেম বেচে দেবে?
নাহলে রামের বিরোধিতা করেছিল কেন সে?
হে রামচন্দ্র!এ কোন ধর্ম বালি বধে সুগ্রীবকে দলে ভেড়াও, এতো রাজনৈতিক দল বদলের খেলা!দলিত শম্বুককে হত্যা করো ক্ষমতাগর্বী হয়ে?

নারীকে গুরুত্ব দিয়েছিল সে। আর এখন নারী সুরক্ষা বিল? বজ্রাঙ্গনা,বীরাঙ্গনা কাব্য–শুধু নারীত্বের মহিমা নিয়ে কবিতা। সুলতানা রিজিয়ার কথা, তথাকথিত অন্য ধর্মের নারী— সমাজে এক বিদ্রোহের সূচনা করেছিল সে।

দেশরক্ষার জন্য দেশপ্রেম চাই। সেই দেশপ্রেমের অনুভব এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়ার সাহস সে দেখিয়েছিল। নিজের ঔরসে নিজের রক্তজাত সন্তানদের চেয়েও, তাদের প্রতি স্নেহ ভালবাসার চেয়েও দেশপ্রেম অনেক বড়।
তার পতাকা তুলেছিল সে।
দেশের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছিল ইন্দ্রজিৎ,তরণী সেনের জীবন!

রাজনৈতিক পরিকল্পনার কারণেই তো সে আন্ডার গ্রাউন্ড প্রকল্প রচনা করেছিল যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞায়— নিকুম্ভিলা যজ্ঞগৃহ নির্মাণ করে পাতাল প্রদেশে। দেববেশী লক্ষ্ণণকে তস্কর, পামর,কলঙ্কী বলার স্পর্ধা দেখিয়েছিল।

সে কত শত বছর আগে জানিয়ে দিয়েছিল দেশপ্রেমের জন্য দেশপ্রেমিকদের কতটা আত্মত্যাগের প্রয়োজন।

দেশপ্রেমের চেয়ে জীবন বড় নয়। কেমন হবে যুদ্ধের প্রস্তুতি, অস্ত্রসজ্জার প্রকৃতি কেমন হবে, কেমন হবে নির্ণায়ক শক্তি তা সে দেখিয়ে দিয়েছিল শব্দ চয়নে ও উচ্চারণজাত ধ্বনির দৃঢ়তায় রাবণের রণসজ্জা পর্বে।

সমাজবিদ্রোহ কাকে বলে? জমিদারতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রহসন বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ লিখে– হানিফদের জাগিয়ে তুলেছিস সে ।

সে ছিল এক দুর্ধর্ষ গেরিলা কবি। কবিতায় দার্ঢ্য শব্দের ঝংকার। ভয়ঙ্কর সব শব্দবাণ শাব্দিক অস্ত্র তার অলংকার।অমিত্রাক্ষর ছন্দে চতুর্দশপদীতে পদচারণা করে বীরত্বে জাগিয়েছিল শব্দপ্রাণ। সে ছিল এক ছান্দসিক মহান!
ধর্ম যে মন্দিরে মসজিদে থাকে না, তার কাব্যশৈলীতে তা বোঝা যায়। দেবের স্বজনপোষণকে ধিক্কার জানিয়েছিল সে।

ন্যায় ছাড়া কোন ধর্মই ধর্ম নয়, দারিদ্র অর্থকষ্টের বিরুদ্ধে কিভাবে সংগ্রাম করতে হয় তা তার কাছ থেকেই শেখা যায়।

বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহের পতাকাবাহী এক অগ্নিক্ষরা কলম তার হাতে ছিল যেন শ্রীমধুসূদন হস্তে শানিত সুদর্শন চক্রের অনন্য শব্দ সৃজক অস্ত্র।

‘চতুরঙ্গে রণরঙ্গে ভুলিব এ জ্বালা
এ বিষম জ্বালা যদি পারি রে ভুলিতে!’