অন্য রণভূমি/তমাল সাহা

শীতে প্রান্তর কি ঘুমিয়ে থাকে? সারারাত আকাশের কান্না শিশির হয়ে ঝরে তার বুকের উপর। প্রান্তর নতুন সব বইয়ের উত্তাপ নিয়ে আগুন পোহায়। বইমেলা জেগে থাকে মহাপ্রান্তর নিয়ে।

অন্য রণভূমি
তমাল সাহা

শীতের মেজাজ কমে না। তবুও পলাশে রঙ ধরে। বসন্ত এসে পড়ে। শুক্লা পঞ্চমীতে চাঁদ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। উঠে আসে আকাশের বুকে। চন্দ্রকলা জ্যোৎস্না ছড়িয়ে দেয় বিশাল রণ প্রান্তরে। তৈরি হতে থাকে ছোট-বড় অসংখ্য শিবির-স্কন্ধাবার। অনীকিনীরা নেমে পড়ে মাঠে। অস্ত্রসমূহ মজুত হতে থাকে বারুদ ঘরে। ‌

নদী সমুদ্র আকাশ পেরিয়ে বা স্থলপথে এসে পড়ে অস্ত্রের কারবারিরা। ‌ অস্ত্র চাই! খরশান, শাণিত অস্ত্র চাই! প্রস্তুতি থেকে উদ্বোধনকাল পর্যন্ত রণসজ্জা আমি দেখতে থাকি। প্রতিনিয়ত সংগ্রহ করি যুদ্ধ প্রস্তুতি ও আয়োজনের অগ্রগতির সংবাদ।

রণসজ্জা কতদূর যেতে পারে? কতদূর গেলে বিজয়ের বৈজয়ন্তী ওড়ে? তা আমি ভাবি। এত অস্ত্র আসে কোত্থেকে? কোথায় যায়? কারা সওদা করে? চিন্তনে মননে মগজে অস্ত্র-গুলি নির্মাণ আমাকে আশ্চর্য করে। আমি ভাবি, মানুষ এত ক্ষমতাধর! এতই তার সৃজন প্রতিভা?

বৈকালিক ধুলো মেখে অপরাহ্ণের সূর্যরাগে রঞ্জিত হয়ে সান্ধ্য নক্ষত্রের আলো মেখে পদাতিকেরা শিবিরগুলি পর্যবেক্ষণ করে যায়। প্রতিদিনই যুদ্ধ চলতে থাকে। অক্ষরের আগুন ও শব্দকে স্পর্শ করে পর্যবেক্ষণের জন্য ভালোবাসার মুখগুলি বার্ষিক এই রণক্ষেত্রে সমবেত হবে বলে প্রতীক্ষা করে দীর্ঘকাল।

শারদ মেলার সংহতি আর বাসন্তিক এই উৎসবে সাযুজ্য থাকে। প্রতিমা যেখানে লক্ষ্য সেখানে পুস্তক অনন্য প্রতিমায় রূপান্তরিত হয়। ‌ প্রতিমা যেখানে মাঙ্গলিক মুহূর্ত তৈরি করে, পুস্তক সেখানে সংহতির মেলবন্ধন গড়ে তোলে।

বই তুলে নাও হাতে, ওটা তোমার হাতিয়ার। ধর্ম বিভাজন তৈরি করে, খন্ডিত করে মানুষকে কিন্তু বিশ্বজুড়ে ভাষার বৈভব ও বৈচিত্র্য সাদরে গৃহীত হয় মানবতার সৃজনে। কারণ ভাষার বর্ণিল বর্ণরাশি প্রজ্ঞা বাড়ায়, ঋদ্ধ করে। বাংলা ইংরেজি পারসি জার্মান স্পেন পৃথিবীর যাবতীয় সমস্ত ভাষার কোন ধর্ম নেই। আক্ষরিক বর্ণমালার উষ্ণতা ও শব্দ উচ্চারণে তীব্রতার আগুন ছড়িয়ে পড়ে আমাদের মধ্যে—কোন হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ জৈন খ্রীষ্টান নয়,সমগ্ৰ মানুষের মধ্যে। কারণ বিস্তৃত হওয়াই আগুন ও উষ্ণতার ধর্ম।

মাতার হাত ধরে শিশুটি বই কেনে, পিতার কাছ থেকে কিশোরী নিজস্ব বইটি দাবি করে,নব তরুণ- তরুণীটি একই সঙ্গে একটির পর একটি বইয়ের পাতা উল্টে যেতে যেতে পরস্পরের আঙুল ছূঁয়ে ফেলে, সাক্ষী থাকে ভালোবাসার উপন্যাস, প্রতিবাদের কাব্যগ্রন্থ, ঋদ্ধ প্রবন্ধের পৃষ্ঠাবলী। বই এইভাবে ঘনতর করে নৈকট্যকে। সান্নিধ্যের হাওয়া ছড়িয়ে পড়ে। আর লড়াকু ঐ ছাত্রছাত্রীরা সময়ের প্রতিবাদ সোচ্চারে ছড়িয়ে দেয় মেলার ময়দানে। বইমেলা তখন জেগে ওঠে অনন্য মহিমায়।

চলো আমরা বইয়ের অরণ্যে,কন্দরে আশ্রয় গ্রহণ করি। বই সমুদ্রের চলমান স্রোতে অবগাহন করি। প্রত্যাসন্ন যুদ্ধে বই আমাদের হাতিয়ার।

জীবনের পরতে পরতে বইতে হয়, সেটাই তো বই।
বই ছাড়া তুমি যাবে কোথায়, কোন দিকে?