হিম পড়া শুরু হয়ে গেছে, শুরু হয়ে গেছে বইয়ের সমাবেশ। ২৫ নভেম্বর কল্যাণীর মাঠে শুরু হয়ে গেল বই উৎসব। এখন পরপর বইমেলার আয়োজন। আমি একটু লিখি, বইয়ের আছে কিনা কোনো প্রয়োজন!

রচনাঃ বইমেলা
তমাল সাহা

বইমেলা এলেই আমি আশ্চর্য হয়ে পড়ি। ভাবি বাংলা বর্ণমালার ব-বর্ণটির এত গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন! বিশ্ব বাংলা বাঙালি বোধ বুদ্ধি বই— আমার সামনে বিস্তৃত হয়ে পড়ে।

বইমেলা তাকে কত নামে ডাকা যায়! সুখে প্রেমিক কত নামে সোনা! মন্টি!এভাবে প্রেমিকাকে ডাকে, আদর সোহাগ করে। তাহলে দাঁড়ালো, তুমি পাঠক প্রেমিক হলে বই তোমার প্রেমিকা। বই আমাদের জীবনে এত গুরুত্বপূর্ণ যে রাজনৈতিক দলেরা বিভিন্ন শিবিরে ভাগ হয়ে যায়। এতে বই পড়ুয়ারা খুবই লাভবান হন। তারা একই অঞ্চলে অনেকবার বই মেলা দেখতে পারেন। বই বুদ্ধিজীবী বিদ্বজ্জন তৈরি করে।
বুক ফেয়ার শব্দটি মনে হলেই আমার মনে হয় বুকে ‘বুক’ সেঁটে যায়! বই সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো কথা নাকি বলেছেন বেট্রোর্ল্ট ব্রেখট— বই একটা হাতিয়ার, ওটা হাতে তুলে নাও। দেখবেন বিশ্ব বিখ্যাত এই মানুষটির নামের সঙ্গে দুবার ব-বর্ণ যুক্ত রয়েছে।

বইমেলার বাহার বাড়ায় কবিতা পাঠ। কোনো কবি কবিতা পাঠের চান্স না পেলে খুবই বিক্ষুব্ধ হন। কবিদের বিশাল সুযোগ এই বইমেলা।বই মানে বন্ধন বা সংহতি হলেও কোন্ কবি আগে, কোন্ কবি পরে কবিতা পাঠ করবেন, এ নিয়ে বিক্ষোভ থেকে যায়। বইমেলায় দেখেছি কবি ক’টা কবিতা পাঠ করার সুযোগ পাবেন অর্থাৎ তিনি সংখ্যাতত্ত্বের গাণিতিক হিসেবে চলে যান আর তার লেখা পৃথিবীর দীর্ঘতম কবিতাটি তিনি পাঠ করতে চান। এবং কেউ কেউ নাছোড়বান্দা হয়ে সেই কবিতাটি পাঠ করবেনই, শ্রোতারা শুনুক আর না শুনুক।
কবিরা কবিতার আসরে উপস্থিত থাকলেও সহযোদ্ধা কবিদের কবিতা শুনবেনই তারও কোন মানে নেই।
মনে করুন কোনো কবি তার প্রকাশিত এবং বিশেষ আলোচিত বইয়ের কবিতা পাঠ করছেন। আমি বলি, কবিতার মর্মার্থ একটু ধরতাই করে দেবেন। তিনি বলেন, এসব অন্তরাল অন্তর্নিহিত কবিতা, বুঝে নিতে হয়।

বাঙালিরা খুব ভালো পাঠক। তাই কলকাতার বইমেলা নাকি পৃথিবীর বৃহত্তম বইমেলা। কবিরাই একমাত্র জীব, খুব পড়েন, অনেক লেখেন এবং না দেখেই লিখে ফেলতে পারেন। আজকের কবিতার পাঠে দেখবেন কবিরা একটার পর একটা বইয়ের স্টলে ঘুরছেন, বই উল্টেপাল্টে দেখছেন কিন্তু এতদিন হাঁটা পথে চারপাশে যা যা দেখেছেন মনে করুন ধর্ষণ গণধর্ষণ পুলিশি দংশন প্রহার প্রজন্মের আর্তরব রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস– এসব বিষয়ে তাদের কোনো কবিতা নেই। আমায় একজন কবি বলেন, এসব রাজনৈতিক বিষয়। রাজনীতি কোনোদিন সাহিত্য হয়? সুতরাং কবিতা হয় না। আমি জানতে চাই, সেই কবি যদি শাসকের কাছ থেকে হাত পেতে মুদ্রা নেন তখন কবি বা তার কবিতা কি শাসকের আর্থিক স্পর্শে রাজনৈতিক হয়? কবি রাজনৈতিক নাই বা হলেন তখন কি শাসকীয় রাজনীতির সঙ্গে কবিতা বা কবি জড়িত এসব প্রশ্ন উঠতে পারে? এটাকে যদি তখন বলা হয় কবির রাষ্ট্রীয় দালালি, তবে কি কোন ভুল হয়?

কবিরা পড়েন, লেখেন কিন্তু দেখেন না। ধৃতরাষ্ট্র দেখতে পেতেন না কিন্তু সঞ্জয়ের কাছে ঘটমান বর্তমান সব শুনে শুনে দেখে নিতেন। আমাদের কবিরা ধৃতরাষ্ট্র। তাদের কোনো সঞ্জয় নেই।

একটি সাড়াজাগানো দেয়াল লিখন মনে পড়ে গেল, একটু ভুল হতে পারে— এই বুর্জোয়া ব্যবস্থায় যে যত পড়ে সে তত মূর্খ হয়। তবে যিনি উচ্চারণ করেছিলেন সেই রাজনৈতিক নেতার নামটি মনে আছে।

কবিরা খুব পড়েন। আমাদের এখানে শীতকালে ঘন ঘন বই মেলা হয়। আমাদের এখানে ঘন ঘন বইমেলা হয়!