মদনমোহন তর্কালঙ্কার মশাই/তমাল সাহা

শিক্ষাবিদ সমাজ সংস্কারক মদনমোহন তর্কালঙ্কারের জন্মদিন আজ, ৩ জানুয়ারি

মদনমোহন তর্কালঙ্কার মশাই
তমাল সাহা

মনে পড়ে সেই যে বেথুয়া শাকের জলাভূমির নাকাশিপাড়া বিল্বগ্রাম। যেখানে অন্ধকার ঘনীভূত হয়ে এলে জোনাকিরা জ্বলে আর নেভে। তারপর ভোর হয়ে এলে অরণ্যের অন্ধকার সাঁতরে পাখিরা শিশু সূর্যের নরম আলোর সঙ্গে খেলা করবে বলে আকাশের দিকে উড়ে আসবে, এমনই কথা ছিল, সেসব আর হয় না।
পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল কিন্তু এখন রাত আর পোহায় কিনা,
তা তো তুমি জানো না তর্কালঙ্কার মশাই? পাখিরাও সেই কলরব কাকলি কূজন করে না। হাই টেনশনের তার, মোবাইলের টাওয়ারের অদৃশ্য বিষক্রিয়ায় তারা হারিয়ে গিয়েছে।

এখন এখানে মন্দিরে মন্দিরে মদনমোহনের পূজা হয়। ডিজিটাল যুগে মদনমোহনও আধুনিক হয়ে গিয়েছে। তার ধাতব অথবা মৃন্ময় মূর্তি সকল ভক্তজনেই চেনে ধর্মের বিপুল ফক্কিবাজিতে।
তোমার কথা কেউ জানেনা মদনমোহন মশাই! এখানে সজীবতার চেয়ে নির্জীবতার কদর বেশি।

কাননে কুসুম কলি সকলি ফুটিল। কী যে বলো!
কাননের কুসুমেরা বেবুশ্যে হয়ে ফোটে ভাগীরথী তীরে সোনাগাছি পাড়ায়।
যারা কলি ছিল তারা ফুটে বড় হয়ে বাসনমাজা অথবা ঘরমোছা মাসি হবে বলে দঙ্গল বেঁধে সোনারপুর থেকে ট্রেনে চলে আসে বিধান নগরে লবণ হ্রদের মহল্লাতে।
তুমি তো বলেছিলে কত ঠাটে বাটে—
লেখাপড়া করে যেই / গাড়ি ঘোড়া চড়ে সেই।
তোমার কবিতার পংক্তিমালা ভুল প্রমাণ করবে বলে পড়াশুনা করে তারা এখন বসে আছে ধর্ণায় অবস্থানে মাতঙ্গিনী হাজরার মূর্তির পায়ের নিচে। উত্তর আধুনিকতার হামলায় তোমার এইসব কবিতা পুরোপুরি ফালতু হয়ে গেছে।

সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি/সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি।
এইসব লাইন এখন অচল। এখন মনে মনে নয়, স্পষ্ট প্রকাশ্যে তারা জোরে জোরে বলে, সারাদিন আমি যেন কামাইবাজি করি/ চোর বলে বলুক, তাতে কী এমন বাহাদুরি!

মদনমোহন মশাই সংস্কৃত পণ্ডিত, বিদ্যাসাগরের সহপাঠী অধ্যাপক হলেই বা কী আসে যায়!
শিশুশিক্ষা, বিধবা বিবাহ সে সবই সত্য কিন্তু এসবই সেকেলে।
পুরনো চাল ভাতে বাড়লেও পুরনো কথা আর চলে না।
তুমিও বাতিল সে তো কবেই হয়ে গিয়েছে ঘোষণা!
হায়! এসব লেখার কোন মানে হয়?

সাবধানে যেন লোভ সামলিয়ে থাকি,
কিছুতে কাহারে যেন নাহি দিই ফাঁকি।