৫ আগস্ট ভোরে কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক বামপন্থী চিন্তাবিদ এবং সক্রিয় যোদ্ধা সরোজ দত্তের বিশাল দেহটি পড়েছিল এরিয়ান্স ক্লাবের মাঠের কোণে গড়ের মাঠের বিশাল প্রান্তরে 

রাষ্ট্রীয় লাইসেন্সপ্রাপ্ত জল্লাদ তাকে হত্যা করে

তার মাথাটি কেটে নিয়ে যায় আর বলে, শুরু হল বামপন্থী বুদ্ধিজীবী খুন

আমাদের হিম্মত দেখে যা রে!

পুলিশ ঘিরেছে আজ আমাদের সমাজ। ভারত জূড়ে কায়েম পুলিশরাজ। পুলিশের পদশব্দ শুনি স্কুল-কলেজ চত্বরে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। গণতন্ত্র হায়! দন্ত বিকশিত করে, হি হি করে হাসে….

পুলিশ দেখেছে রবীন্দ্রনাথ, নাকি রবীন্দ্রনাথ দেখেছি পুলিশ

 তমাল সাহা

সুমহান এই ভারতীয় মহাপ্রান্তরে আমি পুলিশ দেখি ঘন তমিস্রায়।

পুলিশ! পুলিশ! আর পুলিশ! পুলিশ খেলা করে আমার স্বপ্নের ভেতরে।

জেএনইউ চত্বরে আমি পুলিশ দেখি। স্তব্ধ চরাচর। আমি পুলিশ দেখি যাদবপুর সুলেখা মোড়ে।

নিদ্রিত চেতনায় ডেকে উঠি

টুকুন,শোন প্রিয় প্রজন্ম আমার!

এই পুলিশ আমাকে গালি দিয়েছিল। আজ খুলে বলি তোকে ‘ বোকাচোদা’ বলে করেছিল অপমান। আজও প্রান্তিক বেলায় ভুলতে পারিনি এই অপমান। তোর বাবাকে ঢুকিয়ে দিয়েছিল গরাদ ঘরে।

আমি এখনও আঁতকে উঠি ঘুমের ঘোরে।

কবিও দেখেছিল পুলিশ। আই সি ওয়েল ব্ল্যাক পুলিশ ইন ট্রিস।

কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দেখেছিল–

পুলিশ, শুধু পুলিশ এখন গাছের পাতায়, গাছের ফলে/ নরখাদক বাঘের থাবা

তিন ভুবনের নিরাপত্তা!

বিয়াল্লিশের আগস্ট আন্দোলনে আমি পুলিশের নির্মম কান্ডকারখানা দেখেছি

মেদিনীপুর মালভূমে।

উনিশে নভেম্বর উনিশশো সত্তর। আমি দেখেছি এগারোটি মৃতদেহের মুখ আমডাঙায় আছে পড়ে।

২০ শে নভেম্বর,১৯৭০,

হায়নার রাতে ফায়ারিং স্কোয়াডের বুলেটে বেলেঘাটা সিআইটি বিল্ডিংয়ে গুলিবিদ্ধ চারজন যুবকের শালপ্রাংশু লাশ।

১৬ ই ফেব্রুয়ারি,১৯৭১। পুলিশের গুলিতে পাঁচটি যুবক টাল খেয়ে পড়ে গেল পূর্ব বেলেঘাটায়।

২৬ জানুয়ারি ‘৭১, প্রজাতন্ত্র কোথায় যায়? কতদূর যায়? গাঙ্গেয় উপকূলে বালি মেখে শুয়েছিল ছটি লাশ। দুজনের বুকে, একজনের পেটে আর তিনজনের পিঠে ছিল গুলির দাগ।

১ লা জুন ‘৭১। মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেল ন’টি মৃতদেহ। মৃতদেহগুলি ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঝুলে ছিল।

কবি কি মরে? মরেও কি কিছু লেখে?

৫ই আগস্ট ’৭১। পুলিশ সরোজ দত্তকে গুলি করে মারে ময়দানে। কে সরোজ — কবি সাংবাদিক প্রাবন্ধিক এক তেজি লাশ, বামপন্থী চেতনায় উদ্ধত উল্লাস!

জ্যোৎস্নায় গাঙ্গেয় বালুচরে কাশীপুর বরানগররের উপত্যকায় পুলিশকে দেখেছি আমি। দেখেছি আমি রামকৃষ্ণপুর ঘাটে।

হুগলি নদীর জলের ছায়ায়, রাস্তার অ্যাসফল্টে বুটের পদশব্দ শোনা যায়। সশস্ত্র বাহিনী আগ্নেয়াস্ত্র কাঁধে বরানগর পোস্ট অফিসের কাছে। কাশীনাথ দত্ত রোড, চন্দ্র কুমার লেন, রুস্তমজি পার্শি রোডে কত লাশ পড়ে থাকে ১৯৭১-এ ১৩ ও ১৪ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের আগে।

২৮ জুলাই ’৭২ -এ পুলিশ ভয়াবহ খেলাটি খেলেছিল লালবাজারের ভিতর আমি দেখেছি। তামাম ভারতবর্ষ উত্তাল করা মানুষটিকে দাহ করেছিল গোপনে অথচ সতর্ক সশস্ত্র পাহারায়।

পুলিশকে নিয়ে যতসব লেখা, সে লেখাও আমি দেখেছি। অক্ষয় কুমার দত্ত লিখেছে– ‘পঞ্চম বর্ষীয় বালকও থানা ও দারোগার প্রসঙ্গ শুনিয়া সভয়ে মাতৃক্রোড়ে গিয়া বিলীন হয়’।

কবি তুষার রায় পুলিশকে সমঝে চলতে বলেন– পুলিশ ওরে পুলিশ!/ কবির কাছে আসার আগে টুপিটা তোর খুলিস।

কবি মণিভূষণ ভট্টাচার্য আরও এক কদম এগিয়ে লেখেন– ‘এবার প্যাঁদাবো শালা হারামি ওসিকে।’

কবি শঙ্খ ঘোষ তো পরিষ্কার বলে দিয়েছেন– পুলিশ কখনও কোনো অন্যায় করে না যতক্ষণ তারা আমার পুলিশ।

আর রবীন্দ্রনাথ সোজাসাপটা বলে দেন– ‘পুলিশ একবার যে চারায় অল্পমাত্রায় দাঁত বসাইয়াছে সে চারায় কোনোকালে ফুলও ফোটেনা ফলও ধরে না। উহার লালায় বিষ আছে। পুলিশের মারের তো কথাই নাই। তার স্পর্শই সাংঘাতিক। উহাদের খাতা গুপ্ত খাতা। উহাদের চাল যে গুপ্ত চাল।’