বইমেলা মরে গেছে/তমাল সাহা

বইমেলা মরে গেছে
তমাল সাহা

শেষ পর্যন্ত না অবশেষে কোন শব্দের ব্যবহার ভালো কে জানে? বৃহস্পতিবার বার বেলা তখন। আমি দীর্ঘ পা ফেলে গেট পেরিয়ে ঢুকে যাই বইমেলার মাঠে। পেছনে পেছনে হেঁটে চলে আমার ছায়া!

বইয়ের স্টল নেই কী করে বলি! কত বড় বড় প্রকাশককেই তো দেখি। রাজ্যপালকে দেখি, শিক্ষামন্ত্রীকে দেখি। বইমেলা তো! শব্দ নিয়ে দ্বান্দ্বিক ক্রিয়া শুরু হয়, সংঘর্ষ বাধায় আমার মস্তিষ্কের গলিঘুঁজিতে। রাজ্য বুঝি সঙ্গে পাল কেন, শিক্ষা বুঝি সঙ্গে মন্ত্রী কেন তা বুঝি না। পাঁচ নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে পড়ি জাগো বাংলা মেরাপ দেখি। বাউল গান শুনি, লোকনৃত্য দেখি। পঁচিশ শতাংশ নিজের জন্য রাখুন, পঁচাত্তর শতাংশ আমাদের পাঠিয়ে দিন– এই বাণী প্রদানকারী শ্রমিক নেত্রীকে দেখি। বইমেলা তো! জাগো বাংলা শব্দটি নিয়ে ভাবতে থাকি। তবে কি বাংলা এখনো ঘুমিয়ে আছে! বিশ্বভারতী শুনেছি। বিশ্ববাংলা বলতে কি বোঝায় বুঝতে পারিনা।

সে যাই হোক এবার মেলা ঘুরতে শুরু করি। প্রথমেই লিটিল ম্যাগাজিন চত্বরে যাই। লিটিল ম্যাগাজিন মানে ছোট্ট পত্রিকা। সেই সব পত্রিকার স্টলে উল্টে পাল্টে বই দেখি। ছোট্ট বারুদঘরে আগ্নেয় শব্দ খুঁজে পাই না। কাল সুবিমল মিশ্র মারা গেছে। এন্টি গদ্যকার এই বলে সে সর্বজনীন স্বীকৃতি পেয়েছে। লিটিল ম্যাগাজিন তার জন্মের আঁতুড়ঘর ছিল। লিটিল ম্যাগাজিনের উঠোনে তাঁর জন্য কোন স্মরণ বা শ্রদ্ধা নেই। তবু আমি মুষড়ে পড়ি না।

লড়াকু জেলখাটা চলে যাওয়া সেই যোদ্ধা প্রকাশক তো চলে গেছে। তার কথা মনে পড়ে। মনে পড়লেও আমি আর কী করতে পারি?

এবার আমার জনপদের প্রিয় পত্রিকা নিরন্তরের ১৪৩ নম্বর স্টলে চলে যাই। সম্পাদক গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায় ও সহযোগী তটিনী দত্তর সঙ্গে কথা বলি। যাই ১৫২ নম্বর বিজ্ঞান অন্বেষকের স্টলে। তাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলি।
লিটিল ম্যাগাজিন স্টল ছেড়ে ঢুকে পড়ি প্রতিক্ষণের স্টলে। আড্ডা চলে শান্ত সমাহিত ভাবে শুদ্ধব্রত দেবের সাথে। বিশেষ ছাড়ে তিনি আমার হাতে বই তুলে দেন। প্রাক্তন আইপিএস লেখক নজরুল ইসলামের সঙ্গে নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে দীর্ঘ কথাবার্তা হয়। এই বইটি কোনো প্রকাশক ছাপতে না চাইলে তিনি নিজের দায়িত্বে সেটি প্রকাশ করেন। বইটি হট কেকের মত বিক্রি হয়ে যায়।তা হাজারেরও বেশি সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে। তবে বইটির অর্থমূল্য অনেক বেশি বলে আমার মনে হয়।

তারপর দেখতে থাকি সেই সব লেখক মানুষ ও সম্পাদকদের যারা নাছোড় এখনো চারু মজুমদারকে নিয়ে বসে আছে বইমেলার চত্বরে।
হঠাৎ দেখি ভিড়। বইয়ের চেয়ে বিচারপতির দিকে মানুষ ও সাংবাদিক বেশি ঝুঁকে গেছে। এই সময়ের বাংলার বিতর্কিত য়হামান্য বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের অনুপ্রবেশ (!) ঘটেছে বইমেলায়। কে আগে তার সঙ্গে কথা বলবে দ্রুততায়
ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কেউ কেউ দেখি সংবর্ধনার পুষ্পস্তবক নিয়েও দাঁড়িয়ে গেছে।

তবে বইমেলায় কী আর সেই উত্তেজনা আছে, আছে অক্ষরের আগুনের প্রতিবাদী মেজাজ? তবুও নানারকম ভাবে নকশালী ধারা ধরে রাখতে সেই তুঙ্গে ওঠা লড়াইকে বিভিন্ন কৌণিকে বিশ্লেষণ করে বুকের দেয়ালে চারু মজুমদারের ছবি আঁকতে আঁকতে তারা বুড়ো হয়ে যায় আর সেই সব প্রকাশনা নিয়ে তারা এখনো বসে আছে ছোট্ট একটা টেবিলের স্টলে। তাদের অদৃশ্য স্যালুট জানাতে আমার ডান হাতের আঙুলগুলি কপালে উঠে যায়।
নারী চেতনার সেই মেয়েদের মুখগুলি আমি দেখি। চোখে লড়াইয়ের নেশা নিয়ে বসে আছে। আমি বুড়ো হয়ে গিয়েছি। পাতা ঝরে যায়। তারা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কিন্তু আমার এই বুড়ো মুখটি তাদের আর মনে পড়ে না। কত লেখাই না একদিন আমি লিখেছিলাম তাদের এই ছোট্ট পত্রিকায়! বিপ্লবী নারীদের কত রকম বই, বিভিন্ন নারী সংখ্যা নিয়ে তারা এখনো প্রহর গোণে। এই ভালোবাসা কতদূর যেতে পারে, আমাকে ভাবায়।

কংগ্রেস কোনো দোষ করেনি,ভুল করেনি
মুসলিম লীগ কোনো দোষ করেনি, ভুল করেনি
কমিউনিস্ট পার্টি ৪২ ভাগ হয়ে কোনো দোষ করেনি, ভুল করেনি
চারু মজুমদারের দল মাওবাদী হয়ে দোষ করেছে,ভুল করেছে
উপত্যকা জুড়ে শুধু সেই দলটির তারুণ্যের লাশ

কেউ কোনো দোষ করেনি, ভুল করেনি
শুধু ভুল করেছিল নকশালবাড়ির রক্তিম পলাশ
এখনো এখনো তুমি সয়ে যাও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস!

স্টল আছে, প্রতিবাদী বই আছে,প্রতিবাদ কোথায়? বইমেলা মরে গেছে,
ভাঙা শ্মশান কলস পড়ে আছে নিভন্ত চিতায়!

Leave a Reply