ফলের খিদে/তমাল সাহা

দুর্গা লক্ষ্মী কালী ছট জগদ্ধাত্রী কার্তিক কত শত পুজো! চারিদিকে ফলের দোকান– দেবদেবীরা ফল খায়। এখন সব পুজো প্রায় শেষ হয়ে গেছে। গরিবেরা ফল দেখে আর হেঁটে যায়…

ফলের খিদে
তমাল সাহা

একজন গরিব খেটেখাওয়া দিনমজুরের সঙ্গে আমার প্রায়ই দেখা হয়, কথা হয়।
সে কবিগুরু রবীন্দ্র পথে সাধুখাঁদের মুদির দোকানের উল্টোদিকে কালীনগর রোডের মাথায় রোজ বসে থাকে।
এখানে প্রতিদিন সকালে জোগাড়িদের জমায়েত হয়।
লোকটি রাজমিস্তিরিদের জোগাড়ির কাজ করে। বেশ বয়স হয়েছে। গায়ে জোর কম। তাই মজুরিও একটু কম পায়।
কোনোদিন কাজ পায়, কোনোদিন কাজ পায় না। না পেলেও সে বলে, আমার কোনো কষ্ট বা দুঃখ নেই। যেদিন কাজ পাই না সেদিন অন্য দিনগুলোর থেকে যে টাকা অল্প অল্প বাঁচিয়ে রাখি তা দিয়ে কোনমতে চালিয়ে নিই।
একটা ছোট শুকনো পেট। সে আর কত খাবে?

স্বাভাবিক সহজ চালে লোকটা জীবনের কথা কী সুন্দর বলে!

কথায় কথায় সে আমাকে বলে, এই যে পুজোগুলো হয় যেমন দুর্গা,লক্ষ্মী, কালী, ছট,জগদ্ধাত্রী , কার্তিক, সরস্বতী— এসব দিনগুলো এলে আমার খুব ভালো লাগে।

আমি বলি, কেন?
সে বলে, জানো আমার ফল খাবার খুব ইচ্ছে। কিন্তু আমার তো তেমন পয়সা নেই যে ফল কিনে খাবো!
এই যে পুজো তার আগের দিনগুলোতে গান্ধী মোড় থেকে কুঞ্জ বসু রোডের মাথা পর্যন্ত কত রকম ফলের দোকান বসে যায়। জেল্লাদার আলোর নিচে আপেল আঙুর আতা কলা নাশপাতি বাতাবি লেবু কমলালেবু শোভা পায়, ঝকঝক করে।
বৈয়ম ভর্তি খেজুর আখরোট কিসমিসও দেখি।
আমি এই পুজোর কদিন সন্ধ্যাবেলা ওই রাস্তা দিয়ে কয়েক বার কুঞ্জ বসুর রোড থেকে গান্ধী মোড় পর্যন্ত হাঁটাচলা করি আবার ফিরে আসি।

জানো তো দেখারও একটা সুখ আছে।
বারবার এই উজ্জ্বল ফলগুলো যে আমি দেখি আমার ফল অনেকটাই খাওয়া হয়ে যায়।

চোখেরও একটা খিদে আছে।
চোখের খিদে মিটে গেলে পেটের খিদেও আমার মিটে যায়!

সেবার আমার অসুখ হয়েছিল।
জহরলাল নেহেরু হাসপাতালে প্রায় সাত দিন ভর্তি ছিলাম।
আমার বন্ধুরা ফল নিয়ে আমাকে দেখতে গিয়েছিল।
খুব ভালো লেগেছিল, কী বলবো।

অসুখ হলে ফল বন্ধু একাকার হয়ে যায়!