পলাতক/তমাল সাহা

দেশ থেকে একটা লোক পালিয়ে গেল। কেন পালিয়ে গিয়েছিল শুনুন।

পলাতক
তমাল সাহা

পালিয়ে যাওয়া যে
জীবনের একটা বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে
তা দুনিয়াকে চোখে আঙুল দিয়ে
দেখিয়ে দিয়েছিলে তুমি।

কাশীরাম দাসের মহাভারতের ভাষায়
যাকে বলা হয় পলায়ন পর্ব তাকে পরাস্ত করে আমরা তার নাম দিলাম মহানিষ্ক্রমণ—
সে এক ইতিহাস।

গৃহে অন্তরীণ থেকে কি করে পালানোর চক্রান্ত করেছিলে তুমি
পুলিশি রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে
কি করে সংকেত পাঠিয়েছিলে বহির্বিশ্বে
ইথার তরঙ্গের মধ‍্য দিয়ে সুনিপুণ কৌশলে
কে জানে!
তা আজও রহস্য হয়ে আছে।

সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে সিঙ্গাপুর, রাশিয়া, জাপান,জার্মান, হিটলার, ট্রেন,সাবমেরিন, উড়োজাহাজ তোলপাড় কত সে কান্ড!
আর একের পর এক ছদ্মবেশ ধারণের নৈপুণ্যে পুলিশ ইনফরমার, সমগ্র রাষ্ট্র রীতিমত নাজেহাল-নাস্তানাবুদ— কী যে মানুষ ছিলে তুমি!
সারা দুনিয়া উঠেছিল কেঁপে তোমার তাড়নায়।
সামান্য দেশপ্রেমের জন্য এতসব কান্ডকারখানা কেউ করে নাকি?
বুক বিদীর্ণ করে হৃৎপিন্ডটি উপড়ে তুলে নিয়ে তুমি কত সহজেই মৃত্যুর হাতে সঁপে দিয়েছিলে!

স্বদেশ চেতনার চুম্বন রটিয়ে দিলে তুমি
আর ওরা বলল, কুইসলিং!তোজোর কুকুর!
—-ওই দেখো বিশ্বাসঘাতক! সাম্রাজ্যবাদের পা-চাটা কুকুর!

তখন তুমি নিন্দারে লহ
সহজে বলে বার্মা সীমান্তে এসে দাঁড়ালে— আজাদ হিন্দ এক ফৌজি। বন্দেমাতরম!
কদম কদম বঢ়ায়ে যা…

তোমার আর স্বদেশে ফেরা হল না!
দেখা হল না ভোট-কারবারিদের সঙ্গে!
কখনও হিজাব, কখনও পাগড়ি বাঁধার কেরামতি,তরবারি ও ত্রিশূলের সংঘর্ষ,রাজনীতির মাতব্বরদের
দ্বৈত ভূমিকায় অভিনয়—
ভারতীয় গণতন্ত্রের স্বরূপ দেখা থেকে বঞ্চিত হলে তুমি!

তোমার মনে পড়ে কি মান্দালয় জেলের কথা!
কে যেন বলেছিল, তুমি ফিরে এলে
তোমাকে ক্ষমা করবেই না, উপরন্তু তোমাকে রুখে দিতে হাতে তরবারি নিয়ে দাঁড়াবে।
আসলে এরা সকলেই ছিল দেশ কেনাবেচার কারবারি।

তোমাকে রুখতে হবেই তো!
এই রুখে দাঁড়ানোর সঙ্গেই যে রয়েছে
স্বদেশকে লুটেপুটে খাওয়ার সম্পর্ক।
দেশ বেচে খাওয়া এখন এই দেশের নেতাদের কাছে এক বিশাল বাণিজ্য।

আজ তোমাকে মালা দেবে কারা জানো?
যাদের হাতে লেগে আছে
সেই মার্কামারা সততার গন্ধ
যাদের মুখ থেকে গলগল করে বেরিয়ে আসছে আচ্ছে দিনের গনগনে আওয়াজ।

ওই দেখ দূরে বেজে উঠেছে ব্যান্ড!
তোমার ওই সামরিক পোশাকে আর্জব ভঙ্গিতে পদচারণার ছবিটির সামনে
দাঁড়িয়ে আছি আমি।

সত্যি কি মাথাউঁচু করে দাঁড়িয়ে আছি?
ওই ছবিটি দেখলেই বোধ, চেতনা, আবেগ সমস্ত এক হয়ে মাথাটি নত হয়ে আসে।

পৃথিবীতে এই একটি জন্মদিন যার কোন মৃত্যুদিন নেই।