ধর্মীয় দৌরাত্ম্য ও যুদ্ধবিধ্বস্ত এই সময়ে বার্তাবাহী নাটক

ধর্মীয় দৌরাত্ম্য ও যুদ্ধবিধ্বস্ত এই সময়ে বার্তাবাহী নাটক

প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়াঃ
এ তো সেই বিসর্জন নয়, বিজয়ার জয়গান

নাটক বিসর্জন রবীন্দ্রনাথ
নাট্যরূপ সুভাষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রযোজনা চরিত্রায়ন
নির্দেশক তুতুন লাহিড়ী

গাঙ্গেয় জীবনে বিসর্জন শব্দটি প্রাণময় চেতনা নিয়ে বিজয়া হয়ে‌ ফিরে আসে।
প্রশ্ন ওঠে কি বিসর্জন দিতে সমর্থ হলে মানবতা প্রাণ পায়? সেটা জানাতেই বোধ করি রাজর্ষি-র আদল পরিবর্তন করে রবীন্দ্রনাথ বিসর্জনকে প্রাধান্য দেন। দূরদ্রষ্টা ছিলেন তিনি। তাই বোধ করি ব্যঙ্গাত্মক তির্যকে রাজপুরোহিতের নামকরণ করেছিলেন রঘুপতি। বর্তমান সময়ে দক্ষিণ মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর উপকূলে যখন রাম আবহাওয়া ভারী হয়ে ওঠে তখন রঘুপতি নামকরণটি ব্যঞ্জনাবাহী বলে মনে হয়। যদিও এই নাটকে রঘুপতি নামক চরিত্রটি গুরুদেব বা রাজপুরোহিত(শঙ্কর প্রসাদ মুখোপাধ্যায়) অভিঘাতে উচ্চারিত। এই চরিত্রটি এই কাপালিক সময়ে ধর্মীয় বিশ্বাসকে অন্ধকুসংস্কারকে প্রকট করে তুলে নাটকটিকে আসল সংঘাতে পরিণত করেছে এবং তার মর্মমূলে নিয়ে গিয়েছে। তার সংলাপ উচ্চারণ প্রক্ষেপণ শারীরিক বিভঙ্গ নাটকটির একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। হাড়হিম শীতলতায় তিনি উচ্চারণ করতে পারেন রাজরক্ত চাই। নিস্পৃহ অভিব্যক্তিতে তিনি রাজবিরোধিতার উস্কানি দিয়ে চলেন। ব্রাহ্মণ্যত্বের দম্ভে তিনি রাজার উৎখাতে বহিরাগত আক্রমণকেও স্বাগত জানাতে পারেন। এখানে রাষ্ট্রনীতিকে কি ধর্ম শাস্ত্র বা ব্রাহ্মণত্ব নিয়ন্ত্রণ করে? শস্ত্র ও শাস্ত্র একাকার হয়ে যায়।
নাটকের শিরোনাম নির্মাণে তিনি যথার্থ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।
রাষ্ট্রশক্তি যদি গোবিন্দমাণিক্যের মতো রাজাদের যারা পরিচালিত হতো
ধর্মশক্তির বিরুদ্ধাচারণের যুদ্ধে সাধারণ মানুষ কবেই রাজশক্তির পাশে দাঁড়িয়ে গুরুদেবদের পরাস্ত করতে পারতো। নাটকের রাজা( অতনু মজুমদার) বিনম্রভাবে তার মানবিকতা পৌঁছে দিয়েছেন জনদরবারে নিশ্চিত। তার অভিনয় সত্যের দৃঢ়তায় জারিত। ধর্মশক্তি ও রাজশক্তির সংঘাতে যুক্তির জাল সম্প্রসারণে তিনি যে কমতি নন তার অভিনয় শৈলীতে তা উপলব্ধ হয়। তার কিছু অভিনেয় সংলাপ মননে অভিঘাত সৃষ্টি করে।
নাটকে ভিখারিণী অপর্ণা নেই কিন্তু বালিকা(ঋতিকা চ্যাটার্জী) মন্দিরের চাতালে বসে ত্রিপুরেশ্বরী এখানে ভুবনেশ্বরী বলি চায় কিনা এ প্রশ্ন তুলে রাজার হৃদয়কে আরক্ত করে তোলে। অমল তার অভিনয়।
মন্দিরে জীবন সে হতে পারে পশুশাবক তাকে বলি দিয়ে নিজে গর্ভে প্রজন্মপ্রাণ প্রতিষ্ঠা করা যায় না, বলির বদলে জীবনের সৃজন অসম্ভব এমন সত্যে পৌঁছে দিতে চান রাজা তার সহধর্মিণী রাণীকে(স্বাতী প্রসাদ)। রাণীর স্বচ্ছন্দ অভিনয়ে আকুতি আছে।
সেনাপতির( সুখেন্দু সিনহা) চরিত্রায়নও সাবলীল।
নাটকে জয়সিংহ ছাড়া চরিত্রদের নির্দিষ্ট কোনো নাম নেই। রাজধর্ম এবং পুরোহিতের বলিপ্রথা কোথায় মাঙ্গলিকতা তার অনুসন্ধানে ব্যাপৃত দ্বিধাদ্বন্দ্বে দোলায়িত জয়সিংহ (অভিষেক শর্মা)এই নাটকের একটি সম্পদ। তার আত্মবলিদানের মধ্য দিয়েই রাজপুরোহিতের আত্মোপলব্ধির দরজা খুলে যায়। রক্তপাত হিংসা যে সত্য নয়, দেবী যে প্রস্তরীভূত পাষাণী এবং এই জগতে তা মূল্যহীন এই উপলব্ধে পুরোহিত তাকে গোমতীতে বিসর্জন দেন।

দেবতা কি পণ্য হতে পারে? দেবতার নামে মানুষকে মোহাবিষ্ট রেখে ব্রাহ্মণ্যশ্রেণী কি রাজত্বের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে? দেবতার নামে কি মানবিক মূল্যবোধকে খুন করা যায় ? এই প্রশ্নগুলির সদর্থক উত্তরণে সফল হয়েছে এই নাটক। ছাগ বা পশুহত্যা প্রতীক মাত্র। রক্তপাত ও হত্যায় শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করা যে বৈধ নয়, দেবত্বের ভূমিকা বড় করে দেখিয়ে মানবিকতাকে নষ্ট করা যথার্থ নয় তার রবীন্দ্রনাথ বারবার বলেছেন। বর্তমান সময় প্রেক্ষিতে ভারতীয় উপকূলে ধর্মীয় নেশায় প্রশাসন যখন প্রবল হয়ে উঠেছে, ইউক্রেন ও গাজা উপকূল যুদ্ধ বিস্বস্ত, নরসংহারে উন্মত্ত তখন নিশ্চিত ভাবে এই নাটকটি একটি দিশা এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নিশ্চিত একটি প্রতিবাদ। বস্তুনিষ্ঠ সামাজিক দর্শনের এই ভাবনায় জারিত হয়ে নাট্যনির্দেশক দায়বদ্ধতার পরিচয় দিয়েছেন।

নাটকে কিসের বিসর্জন হয়েছে? গুরুর ধর্মীয় দাপট, অহমিকার বিসর্জন ঘটেছে। অপত্য জয়সিংহকে সে হারিয়েছে, বিসর্জন দিয়েছে তাকে। পাষাণী মাতৃমূর্তিকে বিসর্জিত হয়েছে জলে । তবে সত্যিই কি জয়সিংহের বিসর্জন ঘটেছে?
বিসর্জন কথার অর্থ বিশেষভাবে সৃজন। বি- সৃজ + অন। নাটকে সৃজনের সূচনা হয়েছে। বিজয়ার গানে উত্তরণ ঘটেছে নাটকের।

মঞ্চ সজ্জা( তুষার চক্রবর্তী), আলোর প্রয়োগ( মনোজ প্রসাদ) আড়ম্বরহীনতায় যথাযথ। শব্দ আবহ ও সঙ্গীতের (সুজয় সেনগুপ্ত) ব্যবহার সুপ্রযুক্ত। রূপসজ্জা { তন্ময় চক্রবর্তী) যথার্থ। সহযোগী নির্দেশক (প্রদীপ বিশ্বাস) যথার্থ সহযোগী।

© তমাল সাহা

Leave a Reply