চশমা,চিতাভস্ম,শ্যাল-উইল’ এর গল্প/তমাল সাহা

আজ ৩০ আগস্ট বিপ্লবী কানাইলাল দত্তের জন্মদিন

চশমা,চিতাভস্ম,শ্যাল-উইল’ এর গল্প
তমাল সাহা

আরে মৃত্যুকে মুখোমুখি দেখব বলেই তো জন্ম।
ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে পেছন ফিরে দাঁড়াবো তা হয় নাকি! গুলি করব সামনাসামনি।
মৃত্যুকে স্বচক্ষে দেখব না? সেটা শীতকাল,১০ নভেম্বর। গট গট করে সে উঠে গেল মঞ্চের সিঁড়ি বেয়ে ফাঁসির মঞ্চে।

চোখে মোটা কাঁচের চশমা। ফাঁসির মঞ্চে ওঠার আগেই দাদা বলেছিল, কিছুই তো থাকবে না,চশমাটা দিয়ে যা! না দাদা। পরে নিস।চশমা ছাড়া ফাঁসির মঞ্চে উঠতে গিয়ে পা কেঁপে গেলে মানুষ মনে করবে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি।

মঞ্চে উঠল সে। মুখে কালো কাপড় পরাতে উদ্যত ফাঁসুড়ে। না,কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে কিছুতেই ফাঁসি নয়। হটাও কাপড়! একদিকে ফাঁসি, অন্যদিকে মৃত্যু আর মাঝখানে আমি, মুখোমুখি মৃত্যু দেখতে চাই।
হিম্মত সাহস প্রত্যয় সম্পর্কিত কত শব্দ শুনেছি সব যেন দৃশ্যমান হয়ে উঠল কানাইয়ের চেহারায়।

গল্পের কি শেষ আছে? ফাঁসি হবে। এর চেয়ে জীবনের সুসংবাদ আর কি হতে পারে! ফাঁসিতে যাচ্ছে এই আনন্দে দেহের ওজন ও মুখের উজ্জ্বল্য বেড়ে গিয়েছিল । ১৬ পাউন্ড!

এই বীর শহীদ মৃত্যুর আগে বলে গিয়েছিল, হ্যাঁ, স্পর্ধার সঙ্গেই বলেছিল আমার শবদেহ নিয়ে শোভাযাত্রা হবে। এ শোভাযাত্রা করতেই হবে। এ শোভাযাত্রা আত্মপ্রচার হলেই বা কি আসে যায়! নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করার জন্যই এই শোভাযাত্রার প্রয়োজন। ফাঁসি হবার পর কাতারে কাতারে মানুষ জড়ো হয়েছিল আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের গেটের সামনে। দেহ বাইরে বেরিয়ে আসতেই নারীদের শঙ্খ ধ্বনি আর পুষ্প বর্ষণের জেরে শেষ যাত্রায় আকাশ বাতাস মেতে উঠেছিল। কাতারে কাতারে মানুষ আর সে কী হুড়োহুড়ি!সবাই কানাইয়ের শববাহী খাট ছুঁতে চায়।

চিতাভস্ম শব্দটি পৃথিবীর ইতিহাস হয়ে গেল। কানাইয়ের চিতাভস্মের পরিমাণ কতখানি ছিল কে জানে! তবে সেই চেতনাময় সুবাস ছড়ানো ছাই উড়ে গিয়েছিল পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। আশ্চর্য! আধ ছটাক ছাই বিক্রি হয়েছিল ৫ টাকাতে।

কতসব ঘটনা!বিচারক জিজ্ঞাসা করেন, জেলখানায় কে জুগিয়েছিল পিস্তল? কানাইয়ের ঝটপট উত্তর, পিস্তল দিয়ে গিয়েছে ক্ষুদিরামের আত্মা।

কি করেছিল কানাইলাল? আলীপুর বোমা মামলায় বাঘা বাঘা বিপ্লবীদের বাঁচাতে বিশ্বাসঘাতক রাজসাক্ষী নরেন গোঁসাইকে খতম করে দিয়েছিল জন্মের মতো। কানাই অগ্নিহোত্রী রাজনৈতিক বালক। জীবনটাই রাজনীতি দিয়ে গড়া। একটা অন্য মাত্রার পলিটিক্যাল ক্রাইসিসে ভুগছিল কানাই। ব্যর্থ হয়ে গেল কিংসফোর্ডকে হত্যা। ‌ হাতেগড়া ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকীর প্রাণ গেল। ‌অথচ প্রথম পর্যায়ে কিংসফোর্ডকে হত্যার দায়িত্ব তো তারই ছিল। অনিবার্য কারণে সেই সুযোগ তার হাতছাড়া হয়ে গেল। আলিপুর বোমার মামলা, গ্রেপ্তার হয়ে গেল বাঘা বাঘা বিপ্লবীরা। কানাই বলে,পি এম- এর বড় অভাব। পলিটিক্যাল মার্ডারার চাই। তুখোড় সব বিপ্লবীদের সান্নিধ্যে এসেছিল কানাই। চারুচন্দ্র রায়, রাসবিহারী বোস ,অরবিন্দ ঘোষ, বারীন ঘোষ সেতো অসংখ্য নাম।
কানাইয়ের কোনো উকিল ছিল না। ‌ আপিল করবে না কানাই? নিজেই কয়েদির পোশাক পরে এজলাসে হাজির হতো। উকিল লাগবে কেন, আমিই তো নরেন গোঁসাইকে হত্যা করেছি। তো! দেশের জন্য প্রাণ যায় তো যাবে!

শিবনাথ শাস্ত্রী বলেন, ফাঁসির আগে গিয়ে দেখি জেলখানার খাঁচায় একটা আবদ্ধ ক্রোধান্বিত সিংহ পদচারণা করছে। আপিল করবে না কানাই? ঝটতি উত্তর,দেয়ার শ্যাল বি নো অ্যাপিল।

আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় বলে গিয়েছেন, ইংরেজিতে কোথায় শ্যাল উইলের ব্যবহার করতে হয় সেটাও শেষ পর্যন্ত যথার্থ শিখিয়ে গিয়েছিল কানাই।