Abtak Khabar : সামুদ্রিক ঢেউ তোলপাড় করে ছুটে আসে। ‌ নিয়ে যায় সবকিছু সমুদ্র গর্ভে। সে কি আর কিছু করে? পাল্টা ঢেউ আবার সমুদ্রতটে আছড়ে পড়ে ফিরিয়ে দেয় কিছু সম্পদ ও ঐশ্বর্য। সমুদ্রের এই খেলা মানুষ দেখতে থাকে। সমুদ্র যে কত কী শেখায়! ‌ পুরনো স্মৃতিরাও ফিরে আসে। মৃতবেলায় তারাও ফিরিয়ে দেয় মস্তিষ্কের ধূসর বারান্দায় কিছু কিছু মণিময় ফেলে আসা দিন। তাই কিছু স্মৃতি জাগরুক হয়ে উঠল ক্রীড়াবিদ ও প্রশিক্ষক নিমাই ঘোষের মৃত্যু সংবাদ পাবার পর। নিমাই দা মরে গেলেন ২৭ জুন ২০২২। ফিরিয়ে দিল কাঁচরাপাড়ার ক্রীড়া সংস্কৃতির কিছু পুরানো সন্দেশ।

ইস্টার্ন রেলের স্পোর্টস মিটৈ গুলজারা সিং, চমক লাল, নিমাই ঘোষদের সেই বিস্ময়কর ২৫ পাক!দৌড়বীর নিমাই দা, কাঁচরাপাড়া রেলের কর্মী। ক্যারেজ বিভাগের ২৬ নং ইলেকট্রিক শপে কাজ করতেন। আমাদের চোখ তো তার দিকে থাকবেই। ‌২৫ পাক প্রতিযোগিতা। ওয়ার্নিং ঘন্টা বাজছে। পাক শেষ হয়ে আসছে,শেষ পাক সমাসন্ন। ‌আমরা বসে আছি হাইন্ডমার্সের গ্যালারিতে। গ্যালারির সামনে দৌড়ন্ত দুরন্ত নিমাই দা। আমাদের বুস্ট আপ চিৎকার। নিমাই দা,নিমাই দা আরো জোরে, আরো জোরে। তখন গুলজারা সিং ফার্স্ট, চমক লাল সেকেন্ড আর থার্ড নিমাই দা। তখন তিন দিনের স্পোর্টস মিট। ‌হিট, সেমিফাইনাল, ফাইনাল। ‌তারপর যখন গুলজারা, চমকলালরা নেই তখন নিমাই দা’কে ফার্স্ট হতে আর আটকায় কে?

আমরা স্কুল পালিয়ে যেতুম হাইন্ডমার্সে কাঁচরাপাড়াকে জেতাতে। শিয়ালদা, কাঁচরাপাড়া, দানাপুর, জামালপুর রেলের ক্রীড়াবিদরা আসতেন। ২৫ পাক ১০ হাজার মিটার ছিল তখন আমাদের আকর্ষণ। নিমাই দা অংশ নিতেন সাড়ে বারো পাক মানে ৫ হাজার মিটার আর ২৫ পাক মানে দশ হাজার মিটারে। ১৯৬১ সালে ২৫ পাকে থার্ড হয়েছিলেন নিমাই দা ‌১৯৬৫-তে হয়েছিলেন প্রথম। ‌পরে কাঁচরাপাড়া থেকে রেল স্পোর্টস মিট উঠে যায়। জামালপুর স্পোর্টস মিটে সেকেন্ড হয়েছিলেন নিমাই দা যতদূর মনে পড়ে।

কাঁচরাপাড়া থেকে ১৯৬৭ সালে জামালপুর স্পোর্টস মিটের পর নিমাই দা স্পোর্টস ছেড়ে দেন। ১৯৬১ সালে অল ইন্ডিয়া স্পোর্টস মিটে অংশ নিয়েছিলেন নিমাই দা, যদিও সেখানে কোনো স্থান দখল করতে পারেননি।

পরে নিমাই দা, কাঁচরাপাড়া সব পেয়েছির আসরে ব্রতচারীর মাধ্যমে কিশোর কিশোরীদের স্বাস্থ্য গঠনের শিবিরে ট্রেনার হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন। সব পেয়েছির আসরের নেতৃত্বে তখন সেই সুপরিচিত ডাকসাইটে ক্রীড়া প্রশিক্ষক সেই ধবধবে জামা প্যান্ট পরিহিত ডাকসাইটে পুলক দা,পুলক সরকার। নিমাই দা ধরমপুর থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে আসতেন সব পেয়েছির আসরের মাঠে।

পরে ১৯৭৪ সালে প্রশিক্ষণ শিবির খুলল হাইন্ডমার্সে। কতসব প্রজন্মকে নিজের হাতে গড়েছেন নিমাই দা। ক্রীড়া সংস্কৃতি ভালবাসতেন আজীবন। প্রশিক্ষণ দিয়েছেন ধরমপুর স্পোর্টিং ক্লাবের মাঠে। নিজের এলাকা শ্যামাপ্রসাদ পল্লীতে রায় গেট মৈত্রী সংঘের মাঠে। নিমাই দা থাকতেন ধরমপুর মাঝিপাড়া পঞ্চায়েত সমিতি সংলগ্ন এলাকায়।

১৯৫৮ সাল থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত হাইন্ডমার্সে অনুষ্ঠিত হয়েছে ইস্টার্ন রেল স্পোর্টস মিট। চীন-ভারত যুদ্ধের জন্য দু’বছর সেই মিনিট বন্ধ ছিল।সেই প্রতিযোগিতায় কাঁচরাপাড়ার দুর্বার শৈলেন ভৌমিক ১০০-২০০ মিটারে,এস কে রায় (সুধীর রায়) ৮০০ মিটারে, সন্তোষ চক্রবর্তী ১৫০০ মিটারে, বিশ্বনাথ ঘোষ ৫ হাজার ও ১০ হাজার মিটারে, রবীন্দ্রনাথ দুবে ৪০০ মিটারে এবং ৪×৪ হানড্রেড রিলে রেসে অংশ নিতেন। হ্যামার থ্রো-তে মনে পড়ছে দীর্ঘদেহী অপূর্ব বিশ্বাস, যোগেশ মন্ডল, এস কে বালার মুখ। ডিসকাস ছুড়তেন গোপাল চক্রবর্তী। হার্ডল রেস ছিল আকর্ষণীয়– রণবীর গুপ্তার কথা মনে পড়ে, তিনি হাইজাম্পেও পারদর্শী ছিলেন। কে ভুলতে পারে বাবু ষব্লক মেথরপট্টির সেই মুনিলাল বাঁশফোড়ের মুখ? কাঁচরাপাড়া পোল ভল্টের মাস্টার, শরীর বেঁকিয়ে উঁচু করে তোলা তার শারীরিক কৌশল। আর ভেসে উঠছে নরেশ চক্রবর্তী, পুতুল মজুমদার, প্রকাশ বিশ্বাসের ক্রীড়াশৈলী, গো অ্যাজ ইউ লাইক-এ অপূর্ব বিশ্বাসের যেমন খুশি সাজোর ওস্তাদি।

এই বিশাল ক্রীড়াকাণ্ডের অন্তরালে ছিলেন সেই ইস্টার্ন রেলওয়ে স্পোর্টস অফিসার যার নাম মুখে মুখে ফিরত সেই গনিয়া সাহেব।

ক্রীড়া উৎসব কাকে বলে? তা একদিন দেখিয়ে দিয়েছিল কাঁচরাপাড়া। সে এক উজ্জ্বল উৎসব। বিশাল তোরণদ্বার। হাইন্ডমার্সের ভিতরে বাইরে উজ্জ্বল রঙিন সব পতাকা পত পত শব্দে উড়ছে।
স্কুল পালিয়ে চলো হাইন্ডমার্সে, কাঁচরাপাড়াকে জেতাও।

ক্রীড়াবিদরা বিভিন্ন ডিভিশন থেকে আসতেন রেল বগিতে। বগি থামত, রেল ইনস্টিটিউটের সামনে পাতা ছিল যে রেললাইন সেখানে। ক্রীড়াবিদদের আহার-আপ্যায়ন করা হতো হার্ণেট কেজি স্কুলের মাঠে যদিও তখন স্কুল ছিল না সেখানে। বেল ইনস্টিটিউটের সুইমিং পুলে ক্রীড়াবিদদের স্নানপর্ব হতো।

কাঁচরাপাড়ায় অনুষ্ঠিত সেই স্পোর্টস মিটে শিয়ালদহ ডিভিশন ফার্স্ট হোত, কাঁচরাপাড়া হোত সেকেন্ড।

বেলা পড়ে আসে। সেইসব ক্রীড়ারত মুখ একের পর এক চলে যায়। সন্ধ্যে হয়ে এলো। চলে গেল সেই সব দশক, এবার চলে গেলেন নিমাই দা– নিমাই ঘোষ।
মুখে ম্লান আলো মেখে বসে আছেন বোধকরি শেষ অ্যাথলেট কাছারিবাজার রোডের সেই মানুষটি রবীন্দ্রনাথ দুবে। এখনও যিনি সেইসব উজ্জ্বল দিনের শেষ মশালটি হাতে ধরে রেখেছেন।

কে জানে কী খেলা খেলিছো তুমি এই জনপদভূমির ক্রীড়ামঞ্চে!