এক কবির বাণিজ্যযাত্রা

তমাল সাহা

পুজোর বিশেষ একটা গন্ধ আছে। আনকোরা গন্ধ। পুজোয় নতুন শাড়ি জামা কাপড়ের একটা অন্য ঘ্রাণ থাকে। সেটাই তো আগমনী সুবাস।

কাশফুল তো ফুটেছেই রেল লাইনের ধারে। তবে আকাশ এখনো সারাদিন জুড়ে সোনালি রোদ গায়ে মাখতে পারেনি। মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছে।

তো ও এসে বলল, এই সুযোগ। এটা নিতেই হবে। কদিন বাদে হয়তো অনুদান দেবে। আমার মন তো তুমি পড়তে পারোনি, বোঝার চেষ্টাও করোনি। মেয়েদের মন একটু ভেজা ভেজা নরমই হয়। ওপর থেকে বোঝা যায় না। এ কথাটা ও বলেছিল বিশ্বকর্মা পুজোর দিন। আর বলেছিল, আজ ভাদ্র মাসের সংক্রান্তি। সে বিশ্বকর্মা পুজো হলেই বা কি? তোমার মা আমাকে বলেছিলেন, সংক্রান্তি সংক্রান্তিই। এদিন কোনো শুভ কাজে হাত দিতে নেই। বৌমা! তুমি তো পড়ুয়া মেয়ে। তুমি তো শিরে সংক্রান্তি– এই প্রবাদটা জানো।তাই ওনার কথামতো আজ কেনাকাটা ঠিক হবে না। উনি আমায় খুব ভালোবাসতেন।

পরদিন। আজ পহেলা আশ্বিন। ও বললো, চলো বেরিয়ে পড়ি। রহস্য রেখে দিচ্ছে। তো বেরিয়ে পড়লাম।

আমি তো ভারবাহক। ও যা যা

করছে দেখে যাচ্ছি। ও-ই নিজের জমানো টাকা থেকে কিনলো একটা অ্যালুমিনিয়ামের কেটলি, হাঁড়ি, পেতলের হাতা ও একটা কেরোসিন স্টোভ। আমি বলি হাতাটা অ্যালুমিনিয়ামের নাও। দাম কম পড়বে। ও আমার দিকে কটমট করে তাকালো। ও বলে, নাড়াচাড়ার পক্ষে পিতলের হাতাই ভালো। তুমি এসব মেয়েলি ব্যাপার কি বুঝবে?

আমি বলি, কি হবে এসব দিয়ে? ও বলে, এবার একটা পারিবারিক দোকান করবো। কিসের দোকান? ও বলে, তুমি ঘুগনি বেচবে। আমি চা বেচবো। ছেলে বেচবে ঝালমুড়ি।

আমি বলি, বেলা শেষ হয়ে এলো। এখন এসব দোকানদারি চলে! রাস্তার ধারে বসলে লোকে কি বলবে? ও বলে, তুমি এসব কী বলছো! তোমার মত মানুষ খেটে খাওয়ার বিষয়ে লজ্জা পাচ্ছো! তুমি না এতসব মানুষের জন্য লেখো, মেহনতি মানুষের জন্য লেখো। লেখা যত সহজ কলমে অক্ষর বসিয়ে দিলেই হলো, প্রয়োগটা কিন্তু খুবই কঠিন। আমি চুপ করে থাকি। তো কী আর করি!

আমরা শূন্য পল্লীতে থাকি। এখানকার পুজোর খুব নামডাক।ক্লাবটির নাম খুবই সুন্দর। শষ্প সংঘ। এই ক্লাবের সকলেই আমাকে চেনে। লেখাজোখা করি বলে একটু পরিচিতি আছে। ওদের সঙ্গে দেখা করলাম। ওরা বলল, আমরা ঠিক ব্যবস্থা করে দেব। আপনি, বৌদি আর আপনার ছেলে তিনটে স্টল করবেন তো? ওই পাশাপাশি করে দেব। কিছু দিতে হবে না। ‘কিছু’ শব্দটা আমার মনে গিঁথে গেলেও চুপ করে রইলাম। ওরা বলল,আমরা আপনার পাশে আছি।

বাড়ি এসে বললাম, ভয় নেই। সব ঠিক হয়ে গেছে। ও বলল, তোমার এত চেনা পরিচিতি তোমাকে তো একটু সুযোগ সুবিধা দেবেই। এটাকে স্বজন-পোষণ বলে। একটু আধটু মেনে নিতে হয়। বিজ্ঞানে একে বলে, অভিযোজন। ডারউইনের থিওরি। মার্কস সাহেবও জানেন। আমার জ্ঞানদাত্রী।

মায়ের কথা মনে পড়ল। নারীরা পূর্ণতা পেলে মা হয়ে যায়!

এবার আমরা দুর্গাপুজোয় দেশীয় দোকান দেব। চায়ের দোকান, ঘুগনির দোকান আর ঝালমুড়ির দোকান। আমি ওকে বলেছিলাম, একটা চপের দোকান দিলে ভালো হতো। তুমি তো বেগুনি, লটে মাছের চপ ভালই বানাও।ও বলল, তা তো ভালোই হয় কিন্তু ওই উনুনের সামনে বসে অত রাত পর্যন্ত চপ ভাজা আমার পক্ষে সহজ হবে না।তারপর রাতে আবার তোমার কত রকম ফাই ফরমাস!

তো আমরা ব্যবসায়ে নামবো। দোকানের তিনটি নাম দেব ছেলের দোকানের নাম ঝালমুড়ি শ্রী, আমার দোকানের নাম ঘুগনিশ্রী, আর ওর দোকানের নাম চাশ্রী।

আমি বললাম, দোকানে একটা বড় ছবি থাকবে।

ও বলল, কার ছবি?

আমি বললাম, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ছবি। উনি বলেছিলেন বাঙালির ব্যবসায়ের মন নেই।

আমরা দেখিয়ে দেবো, বাঙালি ব্যবসা জানে। উনি নিশ্চয়ই আশীর্বাদ করবেন।