একটি অশিক্ষিত নাটক দেখার পর/তমাল সাহা

বর্তমান সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য নাটকঃ শিখখা জাতির মেরুদণ্ড
পরবর্তী প্রর্দশন ২৫ নভেম্বর,২০২৩ একাডেমি অফ ফাইন আর্টস

একটি অশিক্ষিত নাটক দেখার পর
তমাল সাহা

কে কাকে খায়? সময় কি নাটককে খায় অথবা নাটক সময়কে, নাটক বা নাট্যকারের বোধ ও দায় ছুঁয়ে থাকে কোন প্রজ্ঞায়?
নাটক কি শুধুই বৌদ্ধিক চিন্তা? জীবনের বাস্তবতার প্রত্যক্ষ দর্শন-প্রদর্শন করাকে কি বলে, সেটাকে বোঝাবো কোন সংজ্ঞায়?

নাটক কি রাজনীতি করে, নাটকের রাজনীতি, রাজনীতির নাটক কাকে বলে কে জানে? মানুষ পা রেখেছে মাটিতে। মাটিতে চলমান ঘটনাতেই তার বাস্তব চেতনার স্ফূরণ এবং নিজের চিন্তাকে ঋদ্ধকরণ–এটুকুই শুধু বুঝি।

নাটক করত সাহস লাগে, লাগে প্রশস্ত বক্ষ, প্রত্যয় স্পর্ধা এবং হিম্মত এবং পিছাবনী চেতনা। সূচনা পর্বেই বলে রাখি সহজ-সরল এই উপসংহারীয় কথা।

গাঙ্গেয় উপত্যকায় এই সময়ে এই মুহূর্তে শাসকের ভূমিকা, শিক্ষাক্ষেত্রে যে ঘটনা ঘটমান, সরকার কোন প্রক্রিয়ায় ছাত্রছাত্রীদের জীবনের সবকিছু কেড়ে খায়, পাশ না ফেল, ফেল না পাশ, পাশ করেও ফেল, ফেল করেও পাশ কোনো গোলমেলে বিষয় নয় তাই বুঝিয়ে ছাড়ে এই নাটক
লটারি, রিসর্ট, ওএমআর শিট, গুড় বাতাসা, মূল্য বোধের বিপর্যয়, অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সবই উঠে আসে কুশলী এবং কৌশলী তৎপরতায়।
শাব্দিক প্রয়োগেরও নৈপুণ্য আছে নাটকে। এই নৈরাজ্যের নেই রাজ্যে যখন তোমার বাড়ির মানুষেরা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের বারান্দায় তখন কার কার বাড়িতে গো কোটি কোটি টাকা পাওয়া যায়! সেই মুহূর্তে ডিজে না ডিজি, মেরুদণ্ড না মৃত্যুদণ্ড কোনটি সঠিক ধন্দে ফেলে দেন নাট্যকার।

সমস্ত দেব দেবীর চেয়ে কালীঘাট দক্ষিণেশ্বর তারাপীঠের কালী কেন অনন্য তা বুঝতে পারি। ব্যঙ্গে বিদ্রুপে তির্যকে শ্লেষে এ নাটক ভরপুর নয়, সম্পৃক্ত এই নাটক। দর্শক শ্রোতাদের সরাসরি রিঅ্যাকশন প্রত্যক্ষ করা যায়। প্রেক্ষাগৃহ থেকে বহির্গমন কালে দরজার কাছে এমন কথাও শোনা যায়– এ নাটক চালাতে দেবে তো!

আমি নাটক করি না, নাটক দেখি। সামাজিক কোনো সক্রিয়তা নেই আমার। বুঝি এখনো মানুষ নিশ্চুপ নীরব অথচ তার ভিতরে পুঞ্জীভূত আক্রোশ ও প্রতিশোধের ক্রিয়া।

এই নাটকে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা প্রদর্শন একটু হলেও জরুরি ছিল বোধ করি। শিক্ষাক্ষেত্র শিক্ষা দপ্তর ঘুষের কারখানায় পরিণত। শিক্ষামন্ত্রীও একজন নাট্যজীবী এবং বুদ্ধিজীবী। এই শিল্প জগতের বহু সুশীলজন রাষ্ট্রীয় তাঁবেদার ম মুদ্রা-মোহর- ভূষণ ওপদের ঘুষ পেয়ে গিয়েছেন। তাদের মুখোশ প্রদর্শনও এই নাটক প্রত্যাশা করছিল এবং প্রতীক্ষায় ছিল।

ব্যক্তিগত মতে ভয় ও আতঙ্কের পর্ব সংক্ষিপ্তকরণে আগে দেখিয়ে উপসংহারে জার্সির গৌরিকীকরণ পর্বটি দিয়ে সমাপ্তি হলে তীব্রতা বাড়তো কেননা সঞ্জীবের অভিনয়ের দৌরাত্ম্যে গতিময়তা এবং অভিঘাত নির্মাণের মারাত্মক আবহাওয়া লুকিয়ে আছে।

সঞ্জীব সরকার তো বটেই সমান দাপটে অভিনয় করেছেন কমল চট্টোপাধ্যায় এবং শ্যামল চক্রবর্তী। এটা দায়সারা ভাবে বলছি না, নাটকটির সফল মঞ্চায়নে
অন্যান্য ‘অশিক্ষিত শিক্ষক’দের ভূমিকা নিশ্চিত অনিবার্য হয়ে উঠেছে।

নাটকটির প্রচারলিপিতে শিল্পিত মুন্সিয়ানা ও মাধুর্য আছে। অভিনেতা-অভিনেত্রীর পরিবর্তে অশিক্ষিত শিক্ষক, এছাড়া বে-সুরসংগীত, অন্ধকার নিয়ন্ত্রণ, কালিঝুলি, শব্দাক্রমণ, মঞ্চ ভাঙন, প্রধান শিক্ষা ব্যাপারী এবং প্রধান শিক্ষা মুজরিম শব্দগুলির ব্যবহার আকর্ষণীয় মাত্রা এনে দিয়েছে।

নির্দেশক ও রচনাকার দেবাশিস মজুমদারকে কুর্নিশ জানিয়ে বলতে পারি এই সময়ে ‘মানুষ’ এই নাটকটির প্রত্যাশায় ছিল কিন্তু তাদের ইচ্ছাপূরণ ঘটছিল না। তিনি সেটি উপলব্ধে আনতে পেরেছেন এবং মঞ্চায়নের সাহস দেখিয়েছেন।

হে পাঠকবর্গ! এই অশিক্ষিত নাটকটি দেখার বিষয়টি এখন আপনার উপরই নির্ভর করছে।

নাটক শিখখা জাতির মেরুদণ্ড
প্রযোজনা শূদ্রক
নির্দেশনা দেবাশিস মজুমদার