এই জনপদে ফেলুদা-র সঙ্গে দেখা/তমাল সাহা

এই জনপদে ফেলুদা-র সঙ্গে দেখা
তমাল সাহা

আমার কাছে আশ্চর্য রহস্যময় এই জনপদ!
শ্রমিক অধ্যুষিত এই মহল্লা মেহতের ঘামের গন্ধে ভরপুর।
বাতাস ক্রমাগত ভারি হয় সেই স্বেদবাষ্পে আশ্চর্য মহিমায় এই গাঁয়ে গঞ্জে।এখানে
পা ফেলেন কতসব প্রজ্ঞাবান মানুষ।
কেন? কিসের তাড়নায় এই জনপদ
ভালো লাগে তাদের?

ফেলুদার বহুমুখী প্রতিভা, সে এক বর্ণময় চরিত্র।
ফেলুদার দাদা মানিকদা-সত্যজিৎ রায়। ফেলুদা সত্যসন্ধানী।
তার দৃষ্টি-পর্যবেক্ষণ তীক্ষ্ণ, তীব্র ও মেধাসম্পন্ন। মানিকদা ও ফেলুদা চলচ্চিত্রে ও চলমান চিত্রে একাকার। মানিকদার নিজস্ব মননের চিন্তায়নের বাস্তবায়ন ফেলুদা।
ফেলুদার বিষয়ে সাধারণ জনের অনুযোগ চাপা ক্ষোভ অভিমানও ছিল। বিজ্ঞাপনী জগতে অবিজ্ঞানসুলভ বিভিন্ন বিষয়ে তার বিজ্ঞাপিত চরিত্র অনেকের মনঃপুত হয় নি।
এক আলোচনায় এক বন্ধু বলেছিলেন, এতো নিন্দাচর্চা, দোষ খোঁজো! মানুষ কি নিখুঁত? চন্দ্রেও কলঙ্ক থাকে।
সে কলঙ্ক ফেলুদা,উদয়ন পন্ডিতেরও থাকতে পারে
বৈকি!

বাংলা চলচ্চিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আমাদের একটি বিশেষ পাওনা। একসময় তরুণ বয়সে এমন চর্চিত আলোচনা ছিল–
কে বড় অভিনয়ে, উত্তমকুমার না সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়?
শিক্ষিত মানুষের কাছে শিক্ষা জীবনের দিক দিয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিশ্চিত বড়। কিন্তু এ প্রশ্নের অনেকটাই উত্তর দিয়ে গিয়েছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় নিজেই। উত্তমদা যে অনেক বড় মাপের শিল্পী তা নিজে স্বীকার করে নিয়েছেন।

বাংলা সংস্কৃতিতে–সাংস্কৃতিক জগতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিচরণ নিশ্চিত গর্বের ও অহঙ্কারের।
নাট্যকুশলী তিনি।
‘হোমাপাখি’, ‘প্রাণতপস্যা’, ‘নাম জীবন’ ‘টিকটিকি’ ‘নীলকন্ঠ’ মঞ্চায়ণ এক উপলব্ধি– মানবিকতাবোধ ও বাস্তবতা সম্পৃক্ত উপস্থাপনা রয়েছে এইসব অভিনয়ে, নাট্যদৃশ্যে। নাম জীবন-আমি ও আমার বন্ধু কাজল সুর দেখেছিলাম এক সঙ্গে। সেটিই ছিল শেষ শো। নাটক দেখে উত্তেজিত হলেই নাটক শেষে গ্রীনরুমে ঢুকে পড়া ছিল আমাদের অভ্যেস। আমরা দেখা করলুম তার সঙ্গে। আমি বলি, এ নাটক না দেখলে মিস করতুম। — কেমন লাগলো?
আমি বাঙালির সেই পরিচিত পুরোনো শব্দ উচ্চারণ করে বলি, দারুণ! দারুণ!

ফেলুদা তো অনেক পরে।
‘অপুর সংসার’-এ তিনি ‘অপরাজিত’।
‘আতঙ্ক’- এ মাস্টারমশাই ভয়ার্ত। কিন্তু পিছপা নন।
অভিনয় কতদূর যেতে পারে!
বাস্তব কেমন করে চোখের সামনে তুলে ধরা যায় ‘আতঙ্ক’ এক অভিজ্ঞতা জনিত ফসল।
‘মাস্টার মশাই, আপনি কিছূ দেখেন নি’– এ সংলাপ আজ প্রবাদ বাক্য।
‘অগ্রদানী’ বামুন তিনি। পিন্ড ক্ষুধাতুর মানুষ– জীবন মৃত্যুকে একাকার করে ফেলেন তিনি। ক্ষুধাতুর পেট নিয়ে বামুনকেও শ্রাদ্ধ স্বত্যয়নের পিন্ড গলাধঃকরণ করতে হয়।
‘কোনি’তে প্রশিক্ষক নন ফাইটার। আর ‘হীরক রাজার দেশে’তে তিনি জনবিদ্রোহের নেতৃত্বে উদয়ন পন্ডিত।
চলচ্চিত্র ফেস্টিভ্যালে বঙ্গ সংস্কৃতির অবমাননায় তিনি সোচ্চার। বলিউডি প্রাধান্য এবং বিশিষ্ট
একজনের শ্রীময়ী মুখের ৫৪৭টি ছবি দিয়ে উৎসব চত্বরে অনুপ্রেরণাজনিত প্রচার দেখে উৎসবকে ‘সার্কাস’ অভিহিত করতে দ্বিধা বোধ করেন নি।

কবিতায় শব্দের ব্যবহারিক প্রয়োগ, আবৃত্তিতে শব্দপ্রেক্ষণের নৈপুণ্যে অবশ্যই বিরল দৃষ্টান্ত রেখেছেন তিনি। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, শাসকের নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাঁর সংলাপও বহুদূর বিস্তৃত।

এমন মানুষকে দেখেছি, কথা বলেছি কল্যাণী বইমেলা,২০১৩-র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। সঙ্গে পেয়েছি চলচ্চিত্রকার তরুণ মজুমদারকে।

কল্যাণী নদিয়া জেলায়, কৃষ্ণনগরও নদিয়ার অন্তর্ভুক্ত। তিনি কৃষ্ণনগরের আদিম মানুষ। তাই তাঁর কল্যাণীর উপস্থিতিতে ছিল কৃষ্ণনগরের অনুভূতি– ‘তাহলে তো আমি কল্যাণীরও মানুষ, ভূমিপুত্র’– আশ্চর্য সেই সুর–‘কৃষ্ণনগর থেকে কল্যাণী কতদূর!’
‘বইমেলার উদ্বোধনী অগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত থাকুক’– তিনি বলেছিলেন।

১৯৮৬ তে কাঁচরাপাড়া কলেজ ময়দানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অনুপ জালোটার গান আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আবৃত্তি– ওরে বিহঙ্গ, বিহঙ্গ মোর! শুনেছি।
হালিসহর লোকসংস্কৃতি ভবনে বিজয়লক্ষ্মী বর্মন ও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আবৃত্তায়ণ এক অনুভূতিদ্রাবী অনুষ্ঠান।
২০ মার্চ,১৯৯৫ হালিসহর লোকসংস্কৃতি ভবনে ‘সপ্তক’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করে যান।
বাচিক শিল্পী মধুসূদন মণ্ডল জানান, কল্যাণী বিদ্যাসাগর মঞ্চে ‘আবৃত্তিমেলা-২০০৬’ এর অনুষ্ঠানে তিনি বিভিন্ন আঙ্গিকের আবৃত্তি শোনান এক ঘণ্টা পাঁচ মিনিট ধরে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনার অংশীদার আমি নিজে। সেটা আমার অহংকার ও গর্বের। ১৯৯৯ সাল। কাঁচরাপাড়া হাইস্কুলের সুবর্ণ জয়ন্তী বর্ষ। আমি সেই ‘হোগলা পাতা’ হাই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র।
সেবারের অনুষ্ঠানে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে স্কুলের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়।

২০১৩ সালে হালিসহর পৌরসভা কর্তৃক হালিসহর বিষয়ক তথ্য চিত্র নির্মিত হয়। এই তথ্যচিত্রে মূল ভূমিকায় থাকার কথা ছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। কিন্তু শারীরিক অসূস্থতার কারণে তিনি অভিনয় করতে পারেন নি। সেক্ষেত্রে খ্যাতিমান অভিনেতা দীপঙ্কর দে- কে দিয়ে অভিনয় করানো হয়। কিন্তু নেপথ্যে ধারাভাষ্য পাঠে অংশ নেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিচালক মুজিবুর রহমান। এ কথা জানিয়েছেন প্রাক্তন পৌরপ্রধান রবীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। তাকে শ্রদ্ধা জানাতে অবিলম্বে তথ্যচিত্রটির মুক্তি পাওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। এটা হবে তার প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা নিবেদন।

এক সময় কাঁচরাপাড়ার সেই ভবঘুরে গোষ্ঠবিহারী দে- র সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। ২০০৮- একাডেমি অব ফাইন আর্টস-এ গোষ্ঠদা সৌমিত্র বাবুর সঙ্গে ঘুরে ঘুরে চিত্র প্রদর্শনী দেখেন।

কল্যাণী নাট্যচর্চা কেন্দ্রের নাট্যোৎসবে তার নাটক পরিবেশন– নিজস্ব অভিনয়, হালিসহর স্টেশন সংলগ্ন পশ্চিম পারে মেরাপ বাঁধা মঞ্চে তার অভিনয়ের নৈপুণ্য দেখেছি।
২০১৬-তে হালিশহরে স্হানীয় সংঘের মাঠে চতুর্থ সৃত্র ও রামধনুর আয়োজনে নাট্যোৎসবের উদ্বোধনে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। ‘ফেরা’ নাটকটি মঞ্চস্থ করেছেন। ২০১৭-তে পরিবেশন করেছেন ইবসেনের ‘দ্য ঘোস্ট’ নাটকের বাংলা অনুবাদ।

‘এক্ষণ’ সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনায় ছিলেন তিনি।

এখনও আছে আমাদের কাছে একটি মানুষ যার পরনে বাঙালি পোশাক– সেই শার্ট এবং ধুতি। তিনি একজন সুইমিং প্রশিক্ষক। নিপীড়িত লাঞ্ছিত মানুষের পক্ষে তার উদাত্ত কণ্ঠের সেই উচ্চারণ– কোনি! ফাইট!কোনি ফাইট!

সেই কোনি এখন অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে হাঁকছে–

ক্ষিদ্দা! তুমি একদিন বলেছিলে ফাইট!
আমি এখন অনেক বড় হয়েছি। তোমার এই প্রান্তিকে এসে আমি নির্দেশ দিচ্ছি–
ক্ষিদ্দা! ফাইট! ফাইট! এন্ড ফাইট!

উথাল পাথাল এখন
সমস্ত সুইমিং পুলের জল।
সেই বাঁধভাঙা জল
কোনির চোখে ছলাৎ ছল।