অবতক-এর বিশেষ প্রতিবেদন বীজপুর পটুয়াপাড়া পর্ব-২/তমাল সাহা

অবতক-এর বিশেষ প্রতিবেদন
বীজপুর পটুয়াপাড়া
পর্ব-২
তমাল সাহা

হায়! মায়ের দামও কমে যায়ঃমনোজ পাল।

হালিশহর ছিল হাবেলিশহর। হাবেলি মানে তো নিশ্চিত সকলেরই জানা। বিশাল প্রাসাদের শহর। বিশাল প্রাসাদ, অদ্ভুত তার কারুকাজ। আরে, ওই যে বিখ্যাত জোড়া শিবের গলি! এখানেই তো রয়েছে টেরাকোটার কাজ, অপূর্ব আশ্চর্য পোড়ামাটি ইট। ভারত সরকার এই দুটি মন্দিরকে ঐতিহ্য হিসেবে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিয়েছে সংরক্ষণের জন্য। মন্দির দুটি খুব বড় নয়,ছোটই। কিন্তু ঐতিহ্য ঐতিহ্যই। শিল্পীর কারুকাজ– হাতের নৈপুণ্য রয়েছে সেখানে। কিন্তু সরকারি সাইন বোর্ড সাইনবোর্ডই হয়ে রয়েছে। দেখভালের লোক নেই। হালিশহর পৌরসভারও সেদিকে নজর নেই। কোথায় সংরক্ষণ? কি বলতে কি বলে ফেলি? আসলে শিল্পী নিয়ে কথা তো,তাই এটাও শিল্পের মধ্যেই পড়ে। মৃৎশিল্পের মধ্যেও পড়ে। কারণ এখানে রয়েছে পোড়ামাটির কাজ। ‌ আমরা বলছি দুর্গা মায়ের কথা। তাহলে আর এই মন্দিরই বা বাদ যায় কেন? এ মন্দির তো দুর্গা মায়ের পতির। আমাদের পিতা শিবেরই মন্দির।

যাক এই গলিতেই ছোট্ট কুমোরটুলি। মনোজ পাল, প্রতিমা শিল্পী। ‌ শিল্প এই ভর দুপুরে শিল্পালয়ে নেই। বিশ্রাম নিচ্ছেন,কাজ করছেন কারিগর সুরজিৎ মন্ডল। ‌ মাটির কাজে কি করে এলেন? বলতেই বলেন, ছোটবেলা থেকেই মাটি আমাকে টানে। কলকাতায় কিছু কাজ শিখেছি। এখানে অমর পাল, যাদব পালের কাছে আগে কাজ করেছি। পাল মশাইরা ঠাকুর বানায়। প্রতিমা গড়ে। পাল মশাইরাই শুধু ঠাকুর বানাবে, প্রতিমা গড়বে সেসব দিন চলে গেছে। এসব হল শিল্প, শিল্পের আবার পদবী লাগে নাকি? সুন্দর কথা বলেন সুরজিৎ। সে তখন প্রতিমা যাতে না ফেটে যায় তাতে সাদা কাপড় কাদা জলে ভিজিয়ে ঠাকুরের গায়ে সেঁটে দিচ্ছে। ‌আসলে মায়ের কোমরটি সুন্দর করে গড়ে তুলছেন।

এবার আসল শিল্পী মশাইয়ের কাছে যাই। মনোজ পাল একটু গড়াগড়ি দিচ্ছিলেন কথা বলতেই উঠে বসলেন। মনোজ বাবু বলেন,বুঝেছিলাম এবার সময় ভালো যাবে না। আমি বলি, আপনিই তো বুঝবেন শিল্পী মশাই। হাত দিয়ে মা গড়েন। তিনি বলেন, কেন? আমি আগে বুঝব কেন? আরে আপনার নাম যে মনোজ। মনে মনে যে জন্মায়, আগে থেকেই যে অনেক কিছু জানে সেই তো মনোজ। মনোজ বাবু বলেন, আমরা কি আর তেমন লেখাপড়া জানি! মা বাবা নাম রেখেছেন মনোজ,এতো কি আর বুঝি? শুধোই,ঠাকুর কটা গড়লেন? জবাবে জানান, মাত্র পাঁচটা। তাও বড় নয়, সবই ছোট। একটা মাত্র বায়না হয়েছে। তার মধ্যে বড়টা। আমি বলি, মা মা-ই হয়। তার আবার ছোট-বড় কি? তিনি মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ, ঠিকই তো বলেছেন। এবার বললেন,সেটা যাবে আরে আমাদের হালিশহরের রামসীতা গলির পুজোয়। ওখানকার পুজোর খুব নামডাক আছে। চারটে ছোট প্রতিমার তিনটে বায়না হয়েছে। আর প্রতিমারও তেমন কোনো দাম নেই। সবাই বলে লকডাউন‌। চাঁদাপত্র তেমন নেই। নিজেরাই কোনমতে পুজো করবে বলে মনস্থির করেছে। বলেন,মায়ের দাম আমাদেরও কমাতে হয়েছে। কপালে হাত দিয়ে বলেন,হায়! মায়ের দামও কমে যায়। হাহাকার করতে করতে বাতাস পটুয়াপাড়া দিয়ে ছুটে চলে যায়…